খরচ বাঁচাতে এলপিজিতে রূপান্তর বেড়েছে গাড়ির

Published on 6 September, 2022

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাজমুল আরেফিন তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িতে জ্বালানি হিসেবে এত দিন অকটেন ব্যবহার করতেন।
কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরে খরচ বাঁচাতে তিনি গাড়ির ইঞ্জিনকে কনভারশন বা রূপান্তর করে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) দিয়ে চালানোর উপযোগী করেছেন। ফলে তাঁর জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।

দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে নাজমুল আরেফিনের মতো অনেকেই এখন গাড়ির ইঞ্জিনকে সিএনজির (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস) পাশাপাশি এলপিজিতে চালানোর উপযোগী করে তুলছেন।

গত ৬ আগস্ট জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। ফলে ৮৯ টাকার প্রতি লিটার অকটেন এখন কিনতে হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। বাড়তি এই খরচ এড়াতে গাড়ি ব্যবহারকারীরা এলপিজির দিকে ঝুঁকছেন।

গাড়ির ইঞ্জিনকে এলপিজি ও সিএনজিতে চালানোর উপযোগী করে তোলে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানির দাম বাড়ার পরে গত দুই সপ্তাহে এই কাজ দুই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

জানা গেছে, রাজধানীতে কমবেশি ২০টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি ও সিএনজি উভয় সেবা দিয়ে থাকে। শুধু এলপিজি রূপান্তরের কাজ করে শ খানেক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া এই পরিষেবার জন্য অনলাইনভিত্তিক বেশ কয়েকটি মার্কেটপ্লেসও রয়েছে।

জানতে চাইলে ২০০১ সাল থেকে গাড়ির ইঞ্জিন এলপিজি ও সিএনজিতে রূপান্তরের কাজ করছে সাউদার্ন অটোমোবাইলস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোরঞ্জন ভক্ত প্রথম আলোকে জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে প্রতি মাসে তাদের কাছে এলপিজি ও সিএনজি রূপান্তরের জন্য গড়ে ৫০টা কাজ আসত। কিন্তু তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরে গত ১৩ দিনেই ৭২টি গাড়ি আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি এলপিজিতে ও ২৩টি সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। মনোরঞ্জন ভক্ত আরও বলেন, জ্বালানি তেলের বর্তমান বাজারদর বিবেচনা করলে গাড়ি এলপিজিতে রূপান্তরের ফলে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ সাশ্রয় হবে। আর সিএনজির ক্ষেত্রে অর্থ সাশ্রয় হবে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। এ কারণেই গ্রাহকেরা গাড়ির ইঞ্জিন রূপান্তরে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।

ইনট্র্যাকো সিএনজির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মুকুল হোসেন জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরে গত দুই সপ্তাহে তাঁদের এলপিজি ও সিএনজি রূপান্তরের কাজ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। হঠাৎ জ্বালানির দাম বাড়ায় অনেকে এমন করছেন বলে মনে করেন তিনি।

নাভানা সিএনজির জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানান, তাঁরাও এখন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি কাজ পাচ্ছেন।

গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ পরিষেবা দেওয়া আরেক প্রতিষ্ঠান রাজধানীর শ্যামলী এলাকার কার ডক্টরস লিমিটেডের এমডি এম এ হাকিম জানান, তাঁরা আগে গাড়ির এলপিজি রূপান্তরের কাজ করতেন। চাহিদা কম থাকায় ২০২১ সালে এই সেবা বন্ধ করেন। কিন্তু সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরে তাঁদের কাছে গাড়ির এলপিজি রূপান্তরের জন্য অনেক গ্রাহক সরাসরি আসছেন, আর প্রতিদিন পাঁচ–সাতটা করে ফোনকলও আসছে। সে জন্য তাঁরা নতুন করে এই সেবা চালু করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নিয়মিত সেবা নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা কমলেও এলপিজি রূপান্তরের গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানান অনলাইনভিত্তিক গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ সেবার মার্কেটপ্লেস যান্ত্রিক। প্রতিষ্ঠানটি সব ধরনের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের সেবা দেয়। যান্ত্রিকের সহ–উদ্যোক্তা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা বিপ্লব বিশ্বাস বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে। তবে গাড়ি এলপিজিতে রূপান্তর সেবার গ্রাহক ৭০ শতাংশ বেড়েছে। আগে এক মাসে ১০টা কার্যাদেশ পেলেও এখন এক সপ্তাহেই ১০টা করে কার্যাদেশ পাচ্ছি।’

গাড়ি এলপিজিতে রূপান্তরে লাভ কতটা

বর্তমানে গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) প্রতি লিটারের দাম রাখা হচ্ছে ৫৬ টাকা ৮৫ পয়সা করে। আর সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরে প্রতি লিটার অকটেনের দাম নেওয়া হচ্ছে ১৩৫ টাকা, যা আগে ছিল ৮৯ টাকা।

ইঞ্জিনকে এলপিজি বা সিএনজিতে চালানোর উপযোগী করে তোলার কাজ করে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, সাধারণভাবে ঢাকা শহরের মধ্যে ১ লিটার বা ১৩৫ টাকার অকটেন দিয়ে ১৫০০ সিসির একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ১০–১২ কিলোমিটার যেতে পারে। একই টাকার এলপিজি দিয়ে ১৫–১৬ কিলোমিটার যাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, এলপিজি ব্যবহারে অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে গাড়ি ব্যবহারকারীদের।

তবে তেল ব্যবহারের উপযোগী গাড়িগুলো এলপিজিতে রূপান্তর করা হলে গাড়ির কার্যক্ষমতা কিছুটা কমতে পারে বলে জানিয়েছেন অটোমোবাইল প্রকৌশলীরা।

অন্যদিকে ব্যক্তিগত গাড়ির ইঞ্জিনকে এলপিজি বা সিএনজিতে রূপান্তরের জন্য গাড়ি ও ইঞ্জিনভেদে ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। আর মাইক্রোবাসসহ অন্য গাড়িতে এই খরচ ৮৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সেই হিসাবে যেসব গাড়ির মাইলেজ কম, অর্থাৎ যাঁরা খুবই স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত করেন, তাঁদের জন্য এত টাকা দিয়ে গাড়ি এলপিজিতে চালানোর সেবা নিলেও জ্বালানি খরচ খুব একটা সাশ্রয় না–ও হতে পারে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

Tags: